শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

সবকিছুতে চরমোনাইকে ব্লেইম দিয়ে রাজনীতি করা নিয়া একটু কথা আছে আমার: হাছিব আর রহমান


হেফাজতের বিপর্যয়, ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা, পাঁচকল্লি টুপি, তাবিজ-কবজ ব্যবহার এ সবকিছুর দায় কেন যেন খুব অবাকভাবে একদল অ্যাকটিভিস্টরা চরমোনাইর উপরে চাপায়া দেয়। অথচ হেফাজত নিয়ে এ দলের আত্মরক্ষামূলক বয়ান ছাড়া কোন অংশগ্রহণমূলক কনসার্ণ নাই। ইসলামী রাজনীতি নিয়েও তাদের কোন 'এ কেবলা ও কেবলা' ধরণের অবস্থান নাই বরং নিরেট নির্ভেজাল গোবেচারা টাইপের রাজনীতিই বিগত ৩০ বছর ধরে তারা করে আসছে। পাঁচকল্লি টুপিও তাদের কোন জোর করা ইউনিফর্মও না বরং তাদের দলেরই অনেকে অন্য টুপি ব্যবহার করে। তাবিজ-কবজ নিয়েও তাদের আলাদা কোন সবক নাই। অবস্থান নাই। কিন্তু তারপরও সবকিছুর দায়-দোষ একদল ফেসবুক অ্যাকটিভিস্টরা চরমোনাইর উপর চাপায়া দেয়। এর কারণটা আমি বাইর করতেই পারি না।
সম্প্রতি দুইটা ইস্যু নিয়া হুজুর মহলে সোশ্যাল মিডিয়া গরম হইছে। এক. পাচকল্লি টুপি। ২. তাবিজ-কবজ। এই দুই ইস্যুতেই নেতিবাচকতা ছড়াইছে জামায়াত এবং লা-মাযহাবি সমর্থকরা। কিলাকিলি শুরু করছে তারা। একদম ব্যাপকহারে। কিন্তু সবারই মূল লক্ষবস্তু ছিলো চরমোনাইওয়ালারা। বিষয়টাতে অবাক হইছি আমি।
১. একটু শুরু থেকে শুরু করি। পাঁচকল্লি টুপি নিয়া ভেজাল বাজছে কোন এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মকতবের শিক্ষকের লগে সেখানের স্থানীয় এক বাটপার ধরণের অবিভাবকের সাথে। সেই অবিভাবক মকতবের হুজুরকে টুপি ইস্যুতে অপদস্ত করেছে। সেই অপদস্ত করার ভিডিও সে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছে। পরে সেদিনই সেই বাটপার অবিভাবক ও মকতবের হুজুরের মধ্যে জোড়-মিল-মোহাব্বাত তৈয়ার হয়ে গেছে এবং ভিডিও সে এক্সপাঞ্জ করেছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এই ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে ঐক্যের বুলি আওড়ানো জামায়াত সমর্থক কিছু বক্তারা ব্যাপকভাবে চর্চা শুরু করেছে এবং ফেসবুকে একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি করেছে। আবুল কালাম আজাদ বাশারসহ অনেকেই এটাতে বাজেভাবে অংশ নিয়েছেন। তাদের একটু ফ্রন্টলাইনে থাকা হুজুররা ইনিয়ে-বিনিয়ে টুপি নিয়ে মহাঐক্য ঘোষণা করে লেখালেখি করেছে এবং তাদের ব্যাকফুটে এবং ফেক আইডির আড়ালে থাকা ফেসবুক অ্যাকটিভিস্টরা এই ইস্যুতে চরমোনাইকে এক দু হাত দিয়ে তুমুল গালী-গালাজ করেছে। অথচ ব্যবহারিক দৃষ্টিতে টুপিকেন্দ্রীক গোঁড়ামিতে জামায়াত সমর্থক আলেমদের ধারাকাছেও কেউ নেই! অবশ্য তাদের বক্তাশ্রেণীর টুপি-পাঞ্জাবী আর দাড়ির ব্যবহার আমার কাছে শি'য়ারে শরিয়ত হিসেবে ব্যবহারের চেয়ে পোশাকি ছদ্মবেশের জন্য বেশি ব্যবহার করা হয় বলেই মনে হয় কারণ এই পোশাক ছাড়া ওয়াজ হয় না। কাড়ি কাড়ি টাকা আসে না। যেহেতু দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী এগুলো ইসলামে জরুরী কিছু না বলে তাদের আকিদা বা অবস্থান আছে তাই এই ব্যবহারটা মূলত বিশেষ কারণে বলেই মনে করি আমি। তবে বলে রাখা ভালো - এই পোশাকি ছদ্মবেশের আড়ালে অপকর্ম করার লোকদেরও অভাব নাই এখন। জামায়াত পয়েন্টে লিখছি বলে বাকিরা দুধে মধুতে ধোয়া বিষয়টা এমন না। অনেকেই এই পোশাকের আড়ালে ভয়ানক অপরাধকর্ম করে বেড়ায়। কিন্তু মূল কথা হলো এই পাঁচকল্লি টুপি নিয়ে চরমোনাইকে ধুইছে তারা ইচ্ছামত। অথচ টুপি নিয়ে চরমোনাইওয়ালা কী ভাবে? তাদের চিন্তাধারা কী এসব তারা হয়ত ঘেটেও দেখিনি। শেষমেষ অবশ্য এই ইস্যুতে তারা লজ্জিত হয়েছে এবং ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে যদিও তারা সে লজ্জাটা টের পায়নি। এবারের এ ঘটনায় আরও সুন্দরভাবে বুঝতে পেরেছি কওমি ও কওমিয়াতের কার্যক্রমের উপর জামায়াতের ক্ষোভ কতটা মারাত্মক। তারা কওমিকে মূলত তাদের মত করে ব্যবহার করতে পারলেই প্রশংসা করবে নয়ত কওমিওয়ালারা নিজেদের আদর্শের উপর থাকলে তারা ছেড়ে দেবে না। বরং তুমুলভাবে নেতিবাচকতা ছড়াবে এটাই বাস্তবতা। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের নেশায় পুরো কওমি অঙ্গন নিয়ে নেতিবাচকতা ছড়াতে পারে না বলেই তারা তাদের ক্ষোভ উগড়ে দেয় চরমোনাইর উপর। নয়ত পাঁচকল্লি টুপি বা যে কোন টুপি নিয়ে দেওবন্দি ও কওমির অবস্থানের বাইরে চুল পরিমান এদহার-ওদহারের কোন অবস্থানও চরমোনাইওয়ালাদের নাই। এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আমি।
এ পয়েন্টে খেয়ালযোগ্য : আমি সাদা রংয়ের পাতলা ওই পাঁচকল্লি টুপি ব্যবহার করি না।
এর কিছুদিন পর এলো তাবিজ-কবজের বিষয়টি। এখানে ইস্যু ছিলো শরিয়তে তাবিজ-কবজ ব্যবহারের হুকুম কি সেটা। তা নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে। এটা মুফতী রেজাউল করীম আবরার ভাই বেশ স্বচ্ছতার সাথে পরিস্কার করে দিয়েছেন যে 'কুরআনের আয়াত, হাদিসে বর্ণিত দোয়া বা ভালো অর্থবোধক আরবি লেখাসহ তাবিজ ব্যবহার শরিয়তে জায়েজ আছে।' কিন্তু সমস্যা হলো সেই ডিবেটেও আবরার ভাইর প্রতিপক্ষ যে ছিলো সে চরমোনাই টাইনা আনছে। এবং এ কাজটুকুর কারণেই ওই লোক জামায়াত সমর্থকদের কাছে বিরাট কিছু হয়ে গেছেন। তার পক্ষ নিয়ে তুমুল লড়াই করছে তারা। অথচ চরমোনাইওয়ালারা তাবিজ কবজ সম্পর্কে কী ভাবে, এ বিষয়ে তাদের অবস্থান কি এসব ওই ব্যাটায় খুঁজেও দেখেনি। কমেন্টে কমেন্টে তাবিজের সব দায়ভার চরমোনাইওয়ালাদের উপর চড়িয়ে দেয়া ফেক ফেসবুক মুজাহিদরাও কোনদিন খুঁজে দেখেনি তাবিজের বিষয়ে চরমোনাই কী ভাবে, কী চিন্তা করে। এখন যে বইয়ের পৃষ্টার ছবি ছড়ায়া ছড়ায়া এই বিষয়টি বলা হয়, সেই বই জীবনে হাতে নিয়ে কতজনে দেখেছে তা আমি জানি না। বইয়ে তাবিজের বিষয়ে কি বলা হয়েছে তা কি কখনও তারা ঘেটে দেখেছে কি না আল্লাহ জানেন। এছাড়া কথিত স্বপ্নে পাওয়া ইসমে জাতের তাবিজের নামে যা বলা হয় এসবের বাস্তবতা কী তা কোনদিনই এরা দেখেনি। ফেসবুকে দেখে দেখে মূর্খের মত এসব নিয়ে কথা বলে। অবশ্য যে জাতি মেসেজ ফরওয়ার্ড কইরা মুসলমানিত্ব ঠিক রাখে তারা এগুলাতে বিভ্রান্ত হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক না। কিন্তু মূল কথা হলো তাবিজ বিষয়ে চরমোনাইর কী এখানে? তারা কী এই উপমহাদেশে তাবিজ আনছে না তারা পাচকল্লি টুপি আনছে। তারা এ ক্ষেত্রে কুরআন হাদিসের মানদন্ডে আকাবিরিনে উলামাদের অবস্থানকেই কেবল সমর্থন করে যাচ্ছেন। সেখানে চরমোনাইরে নিয়মিত ধুইতে তারা সিদ্ধহস্ত কেন আমি জানি না। বুঝিও না। এখানেও কথা সেটাই - রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের নেশায় পুরো কওমি অঙ্গন নিয়ে নেতিবাচকতা ছড়াতে পারে না বলেই তারা তাদের ক্ষোভ উগড়ে দেয় চরমোনাইর উপর। নয়ত তাবিজ নিয়ে বা ঝাড়ফুঁক নিয়েও দেওবন্দি ও কওমির অবস্থানের বাইরে চুল পরিমান এদহার-ওদহারের কোন অবস্থানও চরমোনাইওয়ালাদের নাই। এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আমি।
কেবল এই তাবিজ আর টুপিই না! হেফাজত নেতারা গ্রেফতার হয় এটাও চরমোনাইর দোষ! জামায়াত রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে তাও চরমোনাইর দোষ। ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো টুকরো টুকরো হয়, নিয়মিত একে অপরের কাপড় পায়জামা খুলে সেখানেও দুই গ্রুপ ঝগড়া করে ক্লান্ত হয়ে চরমোনাইরেই একটা উষ্টা দিয়ে যায়! যে কোন দলের লেজ ধরে থাকা অনেক হুজুরদের দেখবেন নিজেদের সব পরাজয়, বিপর্যয় সমস্যার দায়ভার চরমোনাইর উপর চাপায়া দিয়ে সুখ সুখ একটা অনুভূতিতে থাকে। তবে এ পয়েন্টে কওমিকেন্দ্রীক ইসলামী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নাই। তাদের অবস্থান, গালীগালাজ, বয়ান-বিবৃতি এগুলো সিরিয়াসলি নেয়ারও কিছু নাই কারন তাদের না আছে কোন রাজনৈতিক স্বপ্ন/প্ল্যান বা ইশতেহার আর না আছে কোন রাজনৈতিক শিক্ষা। বরং 'এ কেবলা ও কেবলা করে করেই' প্রতিটি দল তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। (ঐক্যজোট থেকে শুরু করে সর্বশেষ জমিয়ত পয়েন্টে এসে হিসেব মেলাতে পারেন এসবের। চাইলে প্রমাণ হিসেবে জমিয়তের কেন্দ্র বারিধারা মাদরাসাকেও নিতে পারেন। এ মাদরাসায় এখন কেবল লাঠি-সোটা নিয়ে মারামারি করার বিষয়টা বাকি আছে কেবল!) সেই হিসেবে তারা যা খুশি তা বলতেই পারে। তাছাড়া কওমি মাদরাসায় পড়ুয়ারা প্রচন্ড এককেন্দ্রীক হয়! তারা যেখানেই যায় নিজ চিন্তার বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। এজন্য তাদের এই অবস্থান নিয়ে কথা বলে লাভ নেই কোন। তাদের বরং 'মজবুর' মনে করা যায়।
কিন্তু জামায়াত-শিবির এই অপপ্রচার ও 'চরমোনাই দমানোর রাজনীতি' করে মূলত একটা মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে। বুঝে শুনে। তারা সুকৌশলে সোশ্যাল মিডিয়া কওমির রাজনীতি বা আকিদা কেন্দ্রীক সকল সমস্যায় চরমোনাইকে জড়ায়া দেয়। এতে তাদের মোটাদাগে দুইটা লাভ হয়।
ক. চরমোনাই সমর্থকদের এক প্রকার বাধ্য করে এসব নিয়ে কথা বলতে, ডিফেন্ড করতে! যে কারণে সাংগঠনিক কাজ করতে কিছুটা হলেও গতির কমতি ঘটে বলে তারা মনে করে।
খ. জামায়াতের আকিদাগত ত্রুটি নিয়ে দেওবন্দি আলেমদের অবস্থানকে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছে চরমোনাই তথা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। কোন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা কোন লোভ-লালসায় তাদেরকে কাবু করা যায়নি এখনও। তাই জামায়াত তাদের আকিদাগত দুর্বলতা ঢাকতে এ কাজটা করে যায়। অথচ রাজনৈতিক চিন্তাধারায় তারা এসব ফিকহী বিষয়গুলোকে না আনলেই পারতো। তাদের সাধ্য থাকলে ইসলামী আন্দোলনের রাজনৈতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতো প্রোপার পলিটিক্যাল ওয়েতে। কিন্তু সেটা তারা করে না। করবেও না হয়ত।
বিগত এক যুগের এদেশের ইসলামী রাজনীতিকে চিন্তা করে দেখলে শেষ পর্যায়ে এসে একটা মজার পয়েন্ট পাবেন তা হলো - ইসলামী রাজনীতিতে চরমোনাই তথা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মপন্থাকে খুব সুকৌশলে গ্রহণ করে নিয়েছে জামায়াত। তারা এখন আর সাংগঠনিকভাবে কঠোর সরকার বিরোধীতা বা 'ধরে মেরে কেটে ফেলবো' টাইপের রাজনীতিতে নেই। তাদের বড় একটা অংশই এখন মনে করে 'বিএনপির সাথেও তাদের জোটে থাকা উচিত না'। জোটের রাজনীতিতে আল্টিমেটলী জামায়াতের কোন লাভ হয়নি বলেও তারা স্বীকার করে। অথচ এসবগুলোই ছিলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক কৌশল! শুধু রাজনীতিই না বরং অন্যান্য ধর্মীয় ক্ষেত্রেও তারা চরমোনাইকেই দৃঢ়ভাবে ফলো করছে এখন। লম্বা দাড়িতে এসেছে, ড্রেসকোডের ক্ষেত্রে শিবির ছাড়া তাদের বড় একটা অংশই লম্বা দাড়ি, লম্বা পাঞ্জাবী ও সর্বদা টুপির ব্যবহার পয়েন্টকে গ্রহণ করেছে। কওমি শিক্ষাই যে নিরেট ও প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা এটাও তারা মানতে শুরু করেছে! কিন্তু ক্ষতির দিকটা হলো কওমি মাদরাসা ও দেওবন্দি এই শিক্ষা বিপ্লবকে তারা তাদের রাজনৈতিক অভিলাষে ব্যবহার করার প্ল্যানে এখনও আছে। কিন্তু সে স্বপ্ন তাদের সফল হবে না এটা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি। সোশ্যাল মিডিয়ার অপপ্রচার ভিত্তিক রাজনীতি কারোরই স্থায়ী হবে না ইনশাআল্লাহ।
আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বপ্ন দেখি - প্রতিটি ইসলামী রাজনৈতিক দল প্রচন্ডভাবে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে পরবর্তিতে সত্য সঠিক ও বাস্তবতার উপলব্ধিতে আসবেই। সকলের মধ্যে রাজনৈতিক গাটবন্ধন তৈরি হবে এবং এদেশে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে সুদৃঢ় হবে। তাই কোন দলের বিপর্যয় ও পদস্খলনে আমি কোনভাবেই আশাহত হই না এখন আর।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এক ও নেক হওয়ার তৌফিক দান করুক এবং আমার এই লেখাটা যে একদমই ডিফেন্সিভ লেখা তা স্পষ্টভাবে বুঝার তৌফিক দান করুক আপনাদেরকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ