আব্দুল মতীন।।
পীর শব্দটি শুনলে আমাদের অনেকের মানসপটে ভেসে আসে কতিপয় ভন্ড, বকধার্মিক আর ধান্দাবাজদের কার্যকলাপের চিত্র। এদের বকধার্মিকতা, ভন্ডামী আর লম্পটপনার কারণে পীর এখন একটি গালির পর্যায়ের শব্দ। দেওয়ানবাগী, আটরশি, চদ্রপাড়া, সুরেশ্বরী ইত্যাদী ভন্ডদের পরিচয় যখন “পীর” তখন পীর শব্দটি আর ভালো বলার সুযোগ কোথায়! বিষয়টি যখন এমন, তখন ভালো মন্দ নির্বিশেষে আমরা অনেকেই সব পীরকেই ভন্ড পীর বলে থাকি। কিছু শুনেই বিশ্বাস করা এবং প্রচার করার এই মানসিকতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। কোন বিষয় বিশ্বাস করা আর প্রচার করার আগে অবশ্যই তা ভালোভাবে জানতে হবে।
পীর হলো এমন ধর্মীয় নেতা বা মুরুব্বি যিনি হন আল্লাহ ওয়ালা, মুত্তাকী-পরহেজগার, তিনি হন দুনিয়াবিমুখ, হন মুত্তাবায়ে সুন্নাহ (সুন্নাহ অনুসরী) যার সংস্পর্শে ঈমান আমলে উন্নতি সাধিত হয়। গুনাহের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয় নেক আমলে আগ্রহ তৈরি হয়। দুনিয়াপ্রীতি লোভ লোভ হ্রাস পায়। সর্বোপরী, ঈমান আমল, আখলাক মুয়ামালা মুয়াশারাতে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয় যার সোহবতে আসলে তিনিই হলেন পীর বা ধর্মীয় আধ্যাতিক মুরুব্বি।
আমাদের দেশে এমন পীরের সংখ্যা অসংখ্য অগণিত। যাদের সোহবতে এসে মানুষ মানুষ হয়। কিন্তু প্রচারবিমুখতা, মিশন পরিচলনায় কোন লৌকিকতা না থাকা, ডাট ফাট না থাকা, কোন প্রকার শোডাউন না থাকার কারণে এসকল মনীষিরা লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যান। তারা মুরীদের মুখাপেক্ষী হন না তাই তাদেরকে খুঁজে বের করে নিতে হয়।
এর বিপরীতে ভণ্ডরা আর লম্পটরা এসে যায় মানুষের সামনে। তাদের অপকর্মের কারণে তারা যেমন ভণ্ড লকব পায়, আবার এ থেকে বাদ যায় না সে সব প্রচারবিমুখ প্রকৃত আল্লাহওয়ালারাও। একারণে পীর মানেই মানুষ মনে করে েএরা ভণ্ড, ধান্দাবাজ এরা বকধার্মিক।
মাওলানা সালমান দা.বা. এদেশের হক্কানী পীর মশায়েখদের মধ্যে একজন পীর। একজন আল্লাহওয়ালা, একজন বুজুর্গ। তিনি একজন ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্বিক মুরুব্বী। সহজ- সরলতা, বিনয় আর নম্রতায় তিনি প্রবাদ পুরুষ। উদার মানসিকতা, মনের প্রশস্ততা, লিল্লাহিয়াত আর প্রচারবিমুখতায় তিনি অনন্য। সাদামাটা জীবনে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা তার জীবনের দর্শন। কথায় নয় কাজে, জোশে নয় হুশে কাজ করা তার অনন্য বৈশিষ্ট।
আমার দেখা তিনিই একমাত্র পীর যিনি তার মুরীদদের থেকে সব ধরনের খেদমত গ্রহণ থেকে শুধু বিরত থাকেন না, বরং এমন অনেক প্রমাণ আছে তিনি হন মুরিদদের খাদেম আর মুরীদরা হন তার মাখদুম।
আমার দেখো তিনিই এমন এক পীর যার জীবন যাপন এতো সাধারণ তাকে পরিচয় করে না দিলে কারো পক্ষে সহসায় চেনা সম্ভব নয়। শবগুজারীতে তিনি অন্যসাধারণ মুরিদদের সাথেই বিছানায় শুয়ে পড়েন। তার জন্য বিশেষ কোন গদি, খাট বা পালংক নেই। নেই স্পেশাল খাবারের ম্যানু। নেই স্পেশাল বাহন।
আমার দেখো তিনি এমন এক পীর, কোন মাহফিলে তার সফরসঙ্গী হলে প্রাপ্ত হাদিয়া তিনি সফর সঙ্গীদের মাঝে বিতরণ করে দেন। মাহফিল কর্তৃপক্ষ গরীব হলে হাদিয়া না নেওয়ার উদাহরণ অনেক।
আমার দেখা তিনি এমন একজন পীর, মুরীদের বাসায় মেহমান হলে মুরীদকে এমনভাবে হাদিয়া করেন, উপায়ন্ত না পেয়ে মুরীদ তার পীর থেকে হাদিয়া নিতে বাধ্য হন। আমার বাসায় যতদিন মেহমান হয়েছেন, আমি নিতে না চাইলে আমার নাবালক শিশুদের নামে হাতে গুজে দিয়ে বলেছেন, আপনাকে দিচ্ছি না, আপনার বাবুকে হাদিয়া করলাম।
আমার দেখা তিনি এমন এক পীর, যিনি কখনোই হাদীয়া তোহফা নাজরানা পাওয়ার নূন্যতম ধান্দা করেন না। হাদিয়ার জন্য ধান্দার কৌশলও অবলম্বন করেন না। বরং চলতে ফিরতে মুক্ত হস্তে দান সদকা করা তার অভ্যাস।
আমার দেখা তিনি এমন এক পীর, যাকে কখনো কাজমুক্ত দেখিনি। অহেতুক হাসি তামশা আর গিবত পরচর্চা করতে শুনি নি। কিতাব মুতালায় তিনি নিমজ্জিত থাকেন অবসরে। কোন বইয়ের চুম্বকাংশ পড়ে শুনান সবাইকে। ফটোকপি করে বিতরন করেন সকললে।
আমার দেখা তিনি এমন িএকজন পীর যিনি শুধু খানকাহ নিয়ে পড়ে থাকা পীর নন। তিনি এমন এক যুগ সচেতন পীর যিনি দেশ ও জাতির সমসাময়িক সমস্যা নিয়ে চিন্তিত এবং এসবের সমাধানে নিবৃত্তে কাজ করে যান।
আমার দেখা তিনি এমন এক পীর, যিনি দ্বিনের সকল শাখায় কাজ করে যাচ্ছেন। মানবসেবা, দাওয়াত ও তাবলীগ, অমুসলিমদের মাঝে দ্বিনের দাওয়াত, মাদরাসা শিক্ষার সংস্করণ, মকতব, ইসলামী ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠাসহ সকল দ্বিনি কাজে তিনি ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন
আমার দেখা তিনি এমন পীর যিনি আগামী প্রজন্মের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও আন্ডারগ্রাউন্ড কাজ করে যাচ্ছেন, আগামী প্রজন্ম যেন ঈমান হারা না হয় এজন্য তার চিন্তার যেন শেষ নেই। তিনি জোশে নন হুশে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে দৃশ্যমান আলেমদের মিডিয়ায় তৎপরতা, বাংলাভাষা ও সাহিত্যে আলেমদের তৎপরতা আর সমন্বিত মাদরাসার এই উত্থানের পিছনের কোন না কোন ভাবে মাওলানা সালমান সাহেব দা. বা এর অবদান রয়েছে। এটা অস্বীকার কারার কোন সুযোগ নেই।
আমার দেখা তিনি এমন একজন পীর যিনি হকের সাথে সকল দ্বিনী কাজকে মূল্যায়ণ করেন, কোন কাজকে ছোট বা খাট করে দেখেন না। তার কাছে কেউ আশাহত হন না, তিনি কাজে বিশ্বাসী, হক্কানী সকল পীর মাশায়েখের মূল্যায়ন করেন, আকাবীদের জীবনী, জীবন ও কর্ম নিয়ে স্মারক রচনা করেন।
এছাড়া আরো অনেক অনুপম বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা উল্লেখ করার মতো।
আলহামদুলিল্লাহ! তার এসলাহী মজলিস যেন আসহাবে সুফাফার নমুনা। তার সংস্পর্শে আসলে যে কারো অন্তরে ঈমান আমলের তারাক্কি সাধিত হয়। সুন্নাহের চর্চা হয়। নেক আমলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়, গোনাহের প্রতি ঘৃণা সঞ্চার হয়। সর্বোপরী সুন্দর দ্বিনী জীবন যাপনের দিকনির্দেশা পাওয়া যায়।
আল্লাহ শায়খের ছায়াকে আমাদের উপর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ করুন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, খায়রুন্নিসা গার্লস মাদরাসা মানিকগঞ্জ


0 মন্তব্যসমূহ