শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

সময়ের আহ্বান

কাউসার আহমদ সুহাইল


বিশিষ্ট সৃজনশীল লেখক ও গবেষক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ সম্পাদিত ‘ইসলাম টাইমস’ পোর্টালটি কিছুদিন আগে বন্ধ হওয়ার ঘোষণা দেখে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলাম। যে দেশে কোটি কোটি টাকা ঘাটতি দিয়ে হাজারো মাদরাসা চলতে পারে, সে দেশে লক্ষ টাকা ঘাটতি নিয়ে একটি সচল মিডিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংবাদ আমাদের জন্য খুবই অপ্রত্যাশিত। 

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার হলো ‘ডিমান্ড এ্যান্ড সাপ্লাই’৷ সে চ্যাপ্টারের মূল বক্তব্য, ‘কোনো জিনিসের সাপ্লাই বেশি হলে তার ডিমান্ড কমে যায়৷ আর সাপ্লাই কম হলে তার ডিমান্ড বেড়ে যায়।’ যেমন—এখনকার বাজারের সস্তা কাঁচামরিচ ও ধুনেপাতার দাম একটা সময়ে সাপ্লাই অভাবে আকাশছোঁয়া দাম হয়ে যায়। 

এ হিসেবটা শুধু অর্থনীতির নয়। এটা জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। সে দিক বিবেচনায় আমার মনে হয়, কোটি টাকার ভর্তুকির ব্যবস্থা করে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা বা পরিচালনা করার চেয়ে বর্তমানের মিডিয়া সন্ত্রাস মোকাবেলায় লক্ষ টাকা ভর্তুকির ব্যবস্থা করে একটা মিডিয়া প্রতিষ্ঠা বা পরিচালনার গুরুত্ব কোনো অংশে বেশি বৈ কম নয়।
 
মনে রাখতে হবে, যখন মিডিয়ার ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে বৃটিশ আমলের মতো সরকারি একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে শতো শতো মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা নতুন করে মাদরাসা করতে না দেওয়ার আশংকা ঘনীভূত, সে সময়ে একটা মিডিয়া হাজারো মসজিদ-মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক আবেদন তুলে ধরে এগুলোর রক্ষাকবজ হতে পারে। 

মোটা মাথার আরবদের মতো কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হয়ে দেশ-বিদেশে কিছু টিউবওয়েল স্থাপন বা মসজিদ তৈরি করে জান্নাতের মালিক হওয়ার সহজ স্বপ্নে বিভোর হয়ে বিশ্ব রাজনীতির ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের দাবি তুলে আজ ইহুদি নাসারাদের ক্রিয়ানকে পরিণত হওয়ার মতো ভুল করছি না তো? সেটা আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে। 

আমাদের কাজের মূল্যায়ন দেখতে শত্রুপক্ষের মিডিয়া দাক্ষিণ্যের দিকে অলস তাকিয়ে আর কতো ধোঁকা খেয়ে যাবো? আমাদের গায়ে কাঁদা মাখতে সদা প্রস্তুত ঐ মিডিয়াগুলোতে দুয়েকটা প্রোগ্রাম করে আর কতো তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবো? সময় এসেছে চিন্তা করার। এ দেশের মিডিয়া, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতিকে নিয়ে যে আমাদের সুন্দর ভাবনা আছে, এটা কি আমরা জাতির সামনে তুলে ধরতে পেরেছি? হতাশাগ্রস্থ এ সমাজ ও রাষ্ট্রের মুক্তির ফর্মুলা যে একমাত্র ইসলামের কাছেই আছে, এটা কি সমাজকে জানাতে পেরেছি?

আমরাই যে এ সমাজের সবচেয়ে নির্ভেজাল, শান্তিপ্রিয়, দুর্নীতিমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ভালো মানুষ, এটা কি জাতির সামনে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছি? পারিনি। কারন আমাদের নিজস্ব কোনো মিডিয়া নেই। জাতির সামনে শত্রুকর্তৃক আমরা বিচিত্রভাবে উপস্থাপিত হচ্ছি। আমাদের লক্ষ লোকের সমাগমের ইতিবাচক বিশাল আয়োজন তাদের নজরে না পড়লেও আমাদের ত্রুটিময় দুয়েকটা কর্ম ঠিকই তাদের চোখে ধরা পড়ে।

সময় থাকতেই যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে আমরা বেশিদিন অন্যের করুণা নিয়ে টিকে থাকতে পারবো না। পরিবহনের গতির সঙ্গে সময় ও জীবনের গতি বেড়েছে বহুগুণ। খুব দ্রুত প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হচ্ছে। সময় থাকতেই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে৷ বুঝাতে হবে আমাদেরও অধিকার আছে এ জাতির ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার। মিডিয়ার অভাবে আজ আমরা এগুলো ভুলতে বসেছি। মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের এ যুগে দেশ, জাতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রেখে নিশ্চিন্তে  আলাদা দ্বীপের মানুষের মতো বসবাসের সুযোগ দিনদিন শেষ হতে চলেছে। 

মাথায় রাখতে হবে, সামনের দিনগুলো সংগ্রামের৷ প্রতিপক্ষের সঙ্গে মোকাবেলা করে নিজেদের টিকে থাকার দিন। আর মনস্তাত্ত্বিক সেই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার এই মিডিয়া। তাই অস্তিত্বের স্বার্থে হলেও আমাদেরকে এ দিকে মনোযোগী হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে নিজস্ব সৃজনশীল মিডিয়া ও মিডিয়াকর্মী।
 
এর জন্য আমাদেরকে অনেক বড় বাজেট করতে হবে এবং সেটার ব্যবস্থাও করতে হবে। এক্ষেত্রে দীনদার ধনবান ও বিত্তশালী আলেমদের এগিয়ে আসতে হবে। এটাকেও দীনের বড় তাৎপর্যপূর্ণ খেদমত মনে করতে হবে। এক্ষেত্রে হীনমন্যতা ঝেড়ে একদল তরুণ মেধাবী আলেমকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে বড় মাদরাসাগুলোর পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে কিছু মিডিয়া রাখতে হবে। 

এক্ষেত্রে অর্থ যোগান দেওয়ার জন্য প্রয়োজনে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সেভিংস এ্যাকাউন্টের বাড়তি টাকাকে ডোনেশন হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। যে অর্থকে তাকওয়াশীল আলেম-উলামা বা দীনদার মানুষ নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ  স্বচ্ছ মনে করেন না। তবু পূরণ হোক সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, সময় বড় নির্দয়। সে তার দাবি পূরণে কাউকে ছাড় দেয় না; ছেড়েও দেয় না।

গ্রীন গার্ডেন, উত্তরা, ঢাকা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ