শিরোনাম

[getTicker results="10" label="random" type="ticker"]

রক্তদান

মুহাম্মদুল্লাহ ইয়াসিন 

প্রচ্ছদ : কাজী হাসানুল বান্না

মারকাযুল বুহুসের ফেরদাউস ভাইয়ের খালু বেশ অসুস্থ। নাড়িতে প্যাচ লেগেছে। অপারেশনের জন্য বি পজেটিভ রক্ত লাগবে। রক্ত সংগ্রহে সে দৌড়াদৌড়ি করছে। তার নিজেরও বি পজেটিভ রক্ত। কিন্তু রক্ত লাগবে দুই ব্যাগ। একব্যাগ সে দেবে, আরেক ব্যাগের জন্য লোক খোঁজা হচ্ছে। আমি বেমালুম ভুলেই গেলাম, আমার রক্তের গ্রুপ বি। মনে পড়তেই সাতপাঁচ না ভেবে রক্ত দেওয়ার কথা জানালাম। এর আগে যতোবার রক্ত দেওয়ার কথা বাড়িতে বলেছি, তারা না করেছে। তাই এবার আর জানালাম না। 

সকালে মাদরাসায় এলেন ফেরদাউস ভাই। হুজুরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমাকে সঙ্গী করে উত্তরা রওনা দিলেন। কিছু খাওয়ার সুযোগ হয়নি। মাদরাসায় নাশতার সময়সাড়ে সাতটা। আর তখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছ’টায়। তাই উত্তরা পৌঁছে নাশতা সেরে নিলাম। হাসপাতালে ঢুকতেই দেখলাম, লিফ্টে প্রচুর ভীড়। এক শুভাকাঙ্খী দোতলায় গিয়ে চড়তে বললেন। গেলাম এক দৌড়ে সেখানে। দেখিইন্টার্নি করতে আসা তরুণ-তরুণীর ভীড়। ঐ লিফ্টে চড়ার ইচ্ছে থাকাসত্ত্বেও লজ্জায় নিচে নেমে এলাম। প্রথমতলা থেকে লিফ্টে চড়লাম। এবার অবশ্য তেমন ভীড় নেই। আর ওসব তরুণীও নেই, যারা আমার পাশ কেটে গেলেও লজ্জায় গোটা দেহ ঘেমে যায়।

লিফ্ট থেকে নেমেই কেবিন। সোজা রোগীর কাছে গেলাম। হালপুরসি করলাম। ততোক্ষণে দেওবন্দ থেকে বদর ইমোতে কল করলো। অনেকক্ষণ কথা হলো উর্দুতে। ভাবলামসরকার আমায় রাজাকার তোকমা দেয় কিনা! তাই এলাকার ভাষায় কথা শেষ করে আলবিদা জানালাম।

রক্তদান রুমে গেলাম। নিজ হাতে একটা ফরম পূর্ণ করলাম। কিছুক্ষণ পর এক ছোটো ডাক্তার এলো। হাতে তার শাখা। অবাক হলাম না তেমন। কারণ পত্রিকায় এসেছে, 8 লাখ ভারতীয় এ দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। অথচ আমরা দেওবন্দ পড়ার জন্যও যেতে পারি না। কেউ গেলে, তাকে পাসপোর্ট থাকলেও হেনস্থার শিকার হতে হয়‌। আমাদেরকে তারা মানুষই মনে করে না। এইতো কিছুদিন আগের কথা। সহপাঠী আল আমিন দেওবন্দ থেকে ফেরার পথে দিল্লি পুলিশের হাতে ধরা পড়লো। ওকে আতঙ্কবাদী বলে গুলি করা হলো। শেষ অবধি কিছু রুপি ওদের হাতে গুজে দেওয়ায় প্রাণটা ফিরে পায় সে। এই হলো ভারত। তারা তো এখন বলা শুরু করেছে, ৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, তা নাকি তারা করেছে। বরং এটা নাকি তাদের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানিদের সঙ্গে। আর এই বাংলা নাকি তাদের! আমাদের দুর্বলতার কারণে মাসে মাসে খবর আসে, আজ বিএসএফ-এর গুলিতে অমুক নিহত। ফেলানির তারকাটায় ঝুলন্ত লাশের কথা কে না জানে! 

ফিরে আসি শাখায়। উনি আমার প্রেসার টেস্ট করবেন। নিরুপায় আমি চোখ বুজে আল্লাহ আল্লাহ করলাম। টেস্ট শেষে যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। রক্ত দিতে নির্ধারিত রুমে গেলাম সাড়ে দশটায়। মিনিট সাতেকের মাথায় রক্ত দেওয়া সম্পন্ন হলো। সুঁই খোলার সময় বললাম, ‘রক্ত নেওয়া কি শেষ?’ ডাক্তারবাবু ‘জী’ বলে মাথা নাড়ালো। হতবাক হলাম, এতো অল্প সময়ে রক্ত দেওয়া হয়ে গেলো! অথচ টেরই পেলাম না। অবশ্য তখন আয়াতুল কুরসি শেষ করে সুরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছি। কিন্তু সুরা শেষ না হতেই রক্ত নেওয়া শেষ হয়ে গেলো। সবই ওপরঅলার কারিশমা।

লেখক : শিক্ষাসচিব, কেয়টখালি ইসলামিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা, মুন্সিগঞ্জ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ