আমিন মুনশি : বাংলাদেশকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। ২ দশমিক ২ শতাংশ সুদে চার বছর মেয়াদী এ ঋণ ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাত কিস্তিতে পাওয়া যাবে।
বুধবার (৯ নভেম্বর) সচিবালয়ে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম, শুনলে খুশি হবেন সেভাবেই ঋণ পেতে যাচ্ছি। আগামী ৩ মাসের মধ্যে ঋণ প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। চার বছর মেয়াদী ঋণ ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া যাবে। সাতটি কিস্তিতে ঋণ পাওয়া যাবে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে। হিসাব করে দেখলাম সুদ হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ।’
এনবিআরের আয় বাড়ানোর কথা আইএমএফ জানিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো তা করছিই।’
দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। ওই বৈঠকের পর আইএমএফ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধি দল একটি ‘স্টাফ লেবেল’ চুক্তিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের আর্থিক নীতিমালায় সহায়তা দিতে ৪২ মাস মেয়াদী ওই সমঝোতা হয়েছে। এটির আওতায় প্রায় ৩২০ কোটি মার্কিন ডলারের বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ) এবং অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ও টেকসই রূপ দিতে ১৩০ কোটি ডলারের বর্ধিত তহবিল সুবিধা (ইএফএফ) সহায়তা দেয়া হবে।
আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে এটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। প্রতিনিধি দল তাদের সফরের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইএমএফের কার্যনির্বাহী বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
আইএমএফের এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৬ অক্টোবর ঢাকায় আসে।
বাংলাদেশের ঋণ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয় এ বছরের জুলাইতে। ওই সময় আইএমএফের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টালিনা জর্জিভার কাছে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়ে চিঠি দেয় অর্থ বিভাগ। চিঠিতে ঋণের বিষয়ে আইএমএফকে প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরুর জন্য অনুরোধ করা হয়। তিন বছরের জন্য তিন কিস্তিতে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চায় সরকার। মূলত লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বাজেটের সহায়তা বাবদ এই ঋণ চাওয়া হয়েছে, যদিও তখন ঋণ চাওয়া নিয়ে ‘লুকোচুরি’ খেলেছিল সরকার। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা ঋণ চাইনি। তবে প্রয়োজন হলে চাইব।’
আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। ১০ বছর আগে বর্ধিত ঋণ কর্মসূচি বা ইসিএফের আওতায় ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয় সংস্থাটি। নতুন ভ্যাট আইন প্রণয়নসহ কিছু শর্ত সাপেক্ষে তিন কিস্তিতে ওই ঋণ ছাড় করে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন সহযোগী আইএমএফ।
আড়াই বছরের করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেই চাপ সামাল দিতে বিশ্ব আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান মোড়ল আইএমএফের ঋণ পাওয়া যাবে কি না সেটা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা থেকে শুরু করে সবার মনেই একই প্রশ্ন। আইএমএফ ঋণের জন্য যেসব শর্ত দিচ্ছে, সেসব শর্তের কতটা সরকার মানবে, সেসব প্রশ্নও আছে অনেকের মধ্যে।
নানামুখী এই আলোচনার মধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের বৈঠকের আগে বুধবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে সংস্থাটির কঠিন কোনো শর্ত মেনে নেয়া হবে না।
আর বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই ঋণ পাচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ